সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার

দেশজুড়ে ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ , ০৮:০৯ এএম

অনলাইন সংস্করণ

নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও গত তিন মাসের বকেয়া পরিশোধের জন্য ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আয়োজন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আগামী ১ নভেম্বর অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

 

সাধারণত সরকারের স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদা পূরণে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিল ইস্যুর প্রয়োজন দেখা যায়নি।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। নতুন নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে চলতি মাসে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এটি বর্তমান সরকারের এক মাসে নেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। তবে এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ আগের বিল ও বন্ডের মেয়াদপূর্তিতে অর্থ পরিশোধ কিংবা পুরোনো ঋণের পরিবর্তে নতুন ঋণ নিতে ব্যয় হয়। ফলে মোট ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ এবং নিট ঋণের হিসাব এক নয়।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।

 

এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিলের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড গত ৫ অক্টোবর ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ থাকলেও ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে গত আগস্টের শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ কমানোর লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

 

সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে বিশেষ ট্রেজারি বিলের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতি ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার জন্য ইতিবাচক নয়। তাঁর আশঙ্কা, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানো হলে ঋণের বোঝা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও মনে করেন, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের মেয়াদ শেষ হলে তা পরিশোধের জন্যও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে।

 

নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।