দেশজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬ , ১০:১৮ এএম
অনলাইন সংস্করণ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে
বাংলাদেশের নাগরিকদের মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০
কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশি ঋণের স্থিতিও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে
উঠছে।
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৬০ লাখের মধ্যে থাকলে মাথাপিছু সরকারি ঋণের গড় পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টাকা হতে পারে। এর আগে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা বলে জাতীয় সংসদে লিখিত জবাবে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
সেই হিসাবে অর্থবছর শেষে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার টাকা বাড়তে পারে। তবে মাথাপিছু ঋণের এই হিসাব কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ নয়। সরকারের মোট ঋণকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে গড় পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
কয়েক বছরে বাড়তে পারে সরকারি ঋণ অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ছিল ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরগুলোতেও ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছর শেষে মোট সরকারি ঋণ ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
অন্যদিকে,
বাজেট বক্তৃতায় দেশের ঋণঝুঁকি ‘নিম্ন’ পর্যায় থেকে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশি ঋণ ছাড়িয়েছে ১১৪ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে
দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।
এর মধ্যে সরকারি খাতের ঋণ ৯৫ দশমিক
১০ বিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি খাতের ঋণ ১৯ দশমিক
১৯৮ বিলিয়ন ডলার। মোট বিদেশি ঋণের ৮৭ দশমিক ৫২
শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি। এই ঋণের মধ্যে
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন
ব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থার ঋণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে নেওয়া দ্বিপক্ষীয় ঋণ এবং বাণিজ্যিক
ঋণও রয়েছে।
নতুন বিদেশি সহায়তার চেয়ে ঋণ পরিশোধ বেশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় আগের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ কমে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
একই সময়ে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন অর্থছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধে প্রায় আড়াই গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় ভবিষ্যতে সরকারের ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ায় বাড়ছে চাপ বিদেশি ঋণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তী সময়েও এ ঋণ গ্রহণের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজেটের বড় অংশ যাবে সুদ পরিশোধে চলতি অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
ঋণের অর্থের কার্যকর ব্যবহার জরুরি অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ঋণ বাড়লেই তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে, এমন নয়। ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ঋণের অর্থ অপচয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা এড়িয়ে চলা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।