বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা

দেশজুড়ে ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১১:০২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে জাপান। এ বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা।

বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে গুরুত্ব :

বাংলাদেশে বড় আকারের বিনিয়োগ বাড়াতে দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

 

বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে বৃহৎ লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর এবং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, নীতিমালার উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।

বাণিজ্য বাড়াতে কার্যকর হবে ইপিএ


বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।


দুই নেতার প্রত্যাশা, এ চুক্তি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প খাতের বহুমুখীকরণে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি নিয়েও আরও আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান।

 

জ্বালানি খাতে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ

 

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে জাপানের ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় এ অর্থায়ন করা হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান। ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় এটি জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমাতে অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন তাঁরা।

 

মেট্রোরেল ও বিমানবন্দর উন্নয়নে সহযোগিতা

 

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি, মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের বিষয় রয়েছে।

 

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরি, ডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

 

উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকেও স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

 

প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা

 

প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে জাপানের উন্নয়ন সহায়তার আওতায় একটি টহল জাহাজ এবং সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির অধীনে পাঁচটি টহল নৌযান দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে নির্ভরযোগ্য ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সমর্থন

 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাঁদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে জাপান মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।

 

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দুই নেতা।

 

গাজা পুনর্গঠন এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন তাঁরা। জাতিসংঘের সংস্কার, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে।

 

দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্বের ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের জাপান সফরকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য জাপানি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।