মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল, উদ্বেগে বাংলাদেশ

দেশজুড়ে ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ মার্চ ২০২৬ , ১২:৫৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৮ ডলারের বেশি উঠে গেছে, যা ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর এক দিনে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার পেছনে প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়, ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।


বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ইরানের একাধিক তেল ডিপোসহ বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির পাওনা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। দেশের অপরিশোধিত তেলের প্রায় পুরোটা আসে সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডসহ কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম।


বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ১৯৭০-এর দশকের মতো বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বাড়া এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটছে। ভিয়েতনাম ডিজেল পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে, পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে।


বাংলাদেশেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লেই দেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। দাম যদি ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এদিকে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত থাকায় সরকার কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে, ফলে সরকারকে হয় দাম বাড়াতে হবে, না হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবেদুই ক্ষেত্রেই বাজেটে চাপ বাড়বে।


জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস বাড়ানো, জ্বালানি মজুত বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 

 দেশজুড়ে/ সবুজ