দেশজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২৬ , ০৫:২১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার বহুল আলোচিত ঘটনায় অবশেষে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুলাই স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রের মাধ্যমে বিভাগীয় মামলা নম্বর-১৭২/২০২৬ দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি ওষুধ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও সময়মতো বিতরণ না করে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় রাখা হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে নষ্ট হয়, যা সরকারি সম্পদের অপচয় এবং দায়িত্বে অবহেলার শামিল। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যাওয়ায় সরকারি চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় বিষয়টিকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. মামুনুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কেন তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই আলোচিত ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। সে সময় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে, কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি কোয়ার্টার ভবনের নিচতলার পাঁচটি পরিত্যক্ত কক্ষে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে। রোগীদের মধ্যে নিয়মিত বিতরণ না করায় এসব ওষুধের একটি বড় অংশের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। একই ভবনের আরও কয়েকটি কক্ষে হাসপাতালের জন্য কেনা বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগের সময় ডা. মামুনুর রহমান কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালেই সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। একই সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে। তদন্তে সরকারি ওষুধ সংরক্ষণ, মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে আসে, সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য সরকারি অর্থে সংগ্রহ করা বহু ওষুধ যথাসময়ে রোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিন গুদামজাত অবস্থায় পড়ে থাকার কারণে সেগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। এতে একদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অসংখ্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত রোগী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন অব্যবস্থাপনা সাধারণ মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কাপাসিয়ায় বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচি পালিত হয়। তারা দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় অনিয়ম দীর্ঘ সময় ধরে চললেও তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে না আসা বা সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা প্রশাসনিক তদারকির দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। তাঁদের মতে, সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং, নিরীক্ষা এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এদিকে বিভাগীয় মামলা দায়ের হলেও অনেকের মতে, শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইনে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমানে বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত, শুনানি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার জবাব পর্যালোচনার পর তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল ও স্থানীয় জনগণের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহিতা ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দেশজুড়ে/ সবুজ