সিলেট সীমান্তে মানব পাচারের বিস্তার: শক্তিশালী সিন্ডিকেট, বাড়ছে ঝুঁকি ও ভোগান্তি

দেশজুড়ে ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬ , ০২:০১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা: সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছে না এই অপরাধ। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাচারকারীরা গড়ে তুলেছে আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত সিন্ডিকেট।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের দুর্গম সীমান্ত এলাকা এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। ‘ভিজিট ভিসা বা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে পাচার করা হচ্ছে।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় ২২০০ জন পাচারের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৩০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং এ ঘটনায় জড়িত ৩১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য বলছে, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে মূলত নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা বেশি ঘটে।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, পাচার সিন্ডিকেটে প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে কিছু অসাধু কর্মকর্তা পর্যন্ত জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে থাকা এক সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে, যাদের কার্যক্রম মূলত বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা এলাকায় বিস্তৃত।

 

সূত্র মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সিলেট নগরের একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করে পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করত। এসব এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেক মানুষ। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।

 

এছাড়া বিমানবন্দরভিত্তিক জাল নথিপত্র ব্যবহার, ভুয়া ভিসা তৈরি এবং ‘বডি কন্ট্রাক্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইউরোপে পাচারের ঘটনাও সামনে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে প্রতারণা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। এমনকি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে সিলেটের কয়েকজন তরুণের মৃত্যু হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।

 

বর্তমানে সিলেট বিভাগীয় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ৪৫০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে সাক্ষীর অভাবে অপরাধীদের সাজা পাওয়ার হার ১ শতাংশেরও কম, যা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

 

সম্প্রতি ঈদের ছুটিতেও সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্তে সক্রিয় চক্রগুলো নারীদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টা করছে।

 

গোয়েন্দা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় এই অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।

 

সিলেটের পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, গ্রেফতার ও মামলা চলছে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাচার সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় এনে এবং স্থানীয় দালাল নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে এই অপরাধ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।


দেশজুড়ে/সবুজ