দেশজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ মে ২০২৬ , ১১:৪১ এএম
অনলাইন সংস্করণ
ভারতের
মধ্যপ্রদেশের ভোপালে মডেল ও অভিনেত্রী তিশা
শর্মার রহস্যজনক মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যৌতুকের দাবিতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন—এই প্রশ্নের উত্তর
খুঁজতে তদন্তে নেমেছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই)।
৩৩
বছর বয়সী তিশা শর্মার বিয়ে হয়েছিল আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে। বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় গত ১২ মে
শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে শুরু হয় নানা বিতর্ক ও অভিযোগ-পাল্টা
অভিযোগ।
তদন্ত
সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে ও পরে কী
ঘটেছিল তা জানতে সিসিটিভি
ফুটেজ, মোবাইল কল রেকর্ড, ইন্টারনেট
ও ওয়াই-ফাই লগ, স্মার্ট ডিভাইসের তথ্য এবং ফরেনসিক ম্যাপিংসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তদন্তকারীরা। সম্প্রতি তিশার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বাড়িটির ডিজিটাল ম্যাপিংও সম্পন্ন করেছে সিবিআই।
এ
ঘটনায় তিশার স্বামী সমর্থ সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর মা ও অবসরপ্রাপ্ত
বিচারক গিরিবালা সিংও তদন্তের আওতায় রয়েছেন। তিশার পরিবার অভিযোগ করেছে, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের
দাবিতে তাঁকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের
মুখে পড়তে হয়েছিল।
পরিবারের
দাবি, বিয়ের সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপহার ও সম্পদ দেওয়ার
পরও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তিশাকে অপমান করতেন এবং তাঁদের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে এই বিয়ে মানানসই
নয় বলে মন্তব্য করতেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গিরিবালা সিং।
তিশার
পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তাঁর ওপর
নির্যাতন বেড়ে যায়। স্বামী ও শাশুড়ি তাঁর
গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পরে তাঁকে গর্ভপাত করাতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে গিরিবালা সিং দাবি করেছেন, তিশা নিজেই সন্তান নিতে আগ্রহী ছিলেন না এবং নিজ
সিদ্ধান্তেই গর্ভপাত করেছিলেন।
মৃত্যুর
আগে তিশা পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো কিছু বার্তায় নিজের দুর্বিষহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার। এক বার্তায় তিনি
লিখেছিলেন, তাঁর জীবন ‘জীবন্ত নরক’ হয়ে উঠেছে।
তিশার
বাবা নবনিধি শর্মার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দিন রাতে তিশা শেষবার তাঁর মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে বহুবার ফোন করার পর পরিবারের কাছে
জানানো হয় যে তিশা আর
বেঁচে নেই।
ঘটনার
পর প্রকাশিত প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফাঁসের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে মরদেহে আঘাতের কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হলে তারা পুনরায় ময়নাতদন্তের আবেদন করে। পরে আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।
এদিকে
মামলার অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি সাবেক বিচারক গিরিবালা সিং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর নতুন বিতর্কের
সৃষ্টি হয়েছে। তিশার ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক অবস্থা
নিয়ে তাঁর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তাঁর বক্তব্যকে অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন।
তিশার
স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার শুরু থেকেই তদন্তকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করার চেষ্টা হয়েছে। তাদের দাবি, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত
করা হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে।
অন্যদিকে
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হলেও বিষয়টি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। এ কারণে জনমনে
তৈরি হওয়া প্রশ্ন ও আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে
মধ্যপ্রদেশ সরকার মামলাটির তদন্তভার ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে।
তিশার
বাবা নবনিধি শর্মা বলেছেন, মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত
তাঁদের পরিবার আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
ভারতে
যৌতুকবিরোধী আইন কার্যকর থাকলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এ প্রথার প্রভাব
এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। তিশা শর্মার মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে আবারও নারীর নিরাপত্তা, পারিবারিক সহিংসতা এবং বিচারপ্রাপ্তির বিষয়গুলো জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।