বাংলাদেশে হামের প্রকোপ কমছে না, ১০ সপ্তাহে ৫৭৫ শিশুর মৃত্যু

দেশজুড়ে ডেস্ক

দেশজুড়ে ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ মে ২০২৬ , ১২:০১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

দেশে হামের সংক্রমণ মৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের শুরুতে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য খাতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত হাম এবং হাম-সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ৫৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সময়ে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৭ জনেরও বেশি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে (১৮ থেকে ২৪ মে) হাম এর উপসর্গে ৫৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, নিশ্চিত সংক্রমণের হার কিছুটা কমলেও হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল ৭৩২ জন রোগী।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সংক্রামক রোগের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আক্রান্তের সংখ্যা অনেক সময় পর্যাপ্ত পরীক্ষা বা তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে কম দেখাতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর প্রবণতা পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, শিশুদের পুষ্টিহীনতা, ভিটামিন- কর্মসূচির সীমিত বাস্তবায়ন এবং সচেতনতার অভাব বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরেই উচ্চ পর্যায়ে সংক্রমণ

এপ্রিলের শুরু থেকে দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহেও আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের বেশি ছিল, যা সংক্রমণের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।

একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চের শেষ দিকে যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক অঙ্কে, সেখানে মে মাসের শেষভাগে এসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়।

শুধু টিকা নয়, প্রয়োজন কার্যকর রোগ ব্যবস্থাপনা

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল মাসে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা কার্যক্রমের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের মতে, শুধু নির্দিষ্ট কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আরও ব্যাপক ঘনিষ্ঠ কর্মসূচি প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঈদে বাড়ছে সংক্রমণ বিস্তারের শঙ্কা

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানুষের এই ব্যাপক চলাচল সংক্রমণকে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাস্থ্যবিধি প্রচারে জোর দেওয়ার আহ্বান

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত জরুরি। তবে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার ঘাটতি রয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি রোগ ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় সংক্রমণ মৃত্যুর হার আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।