প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৬ , ১২:২৫ এএম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে—যে নারীরা আন্দোলন,
মানববন্ধন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে
সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, সংসদ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে
তাঁদের উপস্থিতি এত কম কেন?
দেশের
রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে
নারীরা সামনের সারিতে অংশ নিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ধাপে—বিশেষ করে দলীয় মনোনয়ন ও নির্বাচনে—তাঁদের
উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা গত ২৫ বছরের
মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ৪ থেকে ৫
শতাংশ। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল কোনো নারী
প্রার্থীই দেয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা নারীদের সংসদে উপস্থিতি বাড়ালেও তা সবসময় কার্যকর
রাজনৈতিক ক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণী প্রভাব
নিশ্চিত করতে পারে না। সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও জনগণের ম্যান্ডেট
অর্জনের মাধ্যমেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ় হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের সুযোগ সীমিত হওয়াই বড় বাধা। অনেক
রাজনৈতিক দলে এখনো এমন ধারণা রয়েছে যে নারী প্রার্থী
দিলে নির্বাচনে জয় পাওয়া কঠিন।
ফলে মনোনয়ন পর্যায়েই অনেক নারী বাদ পড়ে যান।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক
সহিংসতার আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক আক্রমণ, অনলাইন ট্রোলিং এবং সামাজিক চাপও নারীদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতেও একই বৈপরীত্য দেখা গেছে। আন্দোলনের সময় নারীরা সংগঠক, বক্তা ও সমন্বয়কের ভূমিকায়
সক্রিয় থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নারীরা দলীয় মনোনয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের
আলোচনায় স্থান পাননি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনীতিতে নারীর কম উপস্থিতি শুধু
নারীদের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্যও
ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে নীতি প্রণয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং সামাজিক
ও অর্থনৈতিক খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিতেও নারীদের অবদান উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। তবুও নেতৃত্বের পদে তাঁদের উপস্থিতি সীমিত। তবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পে দেখা গেছে, সুযোগ পেলে নারীরা দক্ষ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এবং তাঁদের নেতৃত্বে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতাও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নারী প্রার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে অন্তত ৩৩ শতাংশে উন্নীত
করা এবং ভবিষ্যতে সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া। পাশাপাশি নারীদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি, সহিংসতা ও অনলাইন বিদ্বেষ
মোকাবিলা এবং নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
তাঁদের
মতে, শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে শুধু ভোটের আয়োজনই যথেষ্ট নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।